মা দুই বছরেই বুঝেছিলেন
ব্রকের বয়স তখন দুই। তার মা প্রথমবার মুখ ফুটে বলেছিলেন — ছেলেটার কিছু একটা আলাদা। শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ বললেন, না। নিউরোলজিস্ট বললেন, না। কাগজে কথাটা লেখা হলো ছয় বছর বয়সে — ততদিনে জীবনের সবচেয়ে জরুরি চারটি বছর পার।
ব্রক, আর তার বাবা-মা ব্রায়ান ও নাইদোনাপেনসিলভেনিয়া, যুক্তরাষ্ট্র

ছবি: চিলড্রেনস হসপিটাল অব ফিলাডেলফিয়া
ব্রকের বয়স যখন দুই, তার বাবা-মা খেয়াল করলেন — সমবয়সী বাচ্চারা যা যা করছে, তাদের ছেলে সেগুলো করছে না। ব্রায়ান আর নাইদোনার মনে একটা শব্দ এসেছিল, নিজেদের মধ্যেই। সেই শব্দটা নিয়ে তারা গেলেন শিশুরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে; তিনি বললেন, দুশ্চিন্তার কিছু নেই। গেলেন নিউরোলজিস্টের কাছে; তিনিও একই কথা বললেন।
ছয় বছর বয়সের আগে কেউ তাদের কথা মেনে নেয়নি।
চারটি বছর ঘরের ভেতর থেকে যেমন দেখায়
চার বছর বয়সে ব্রকের ঝুলিতে ছিল কুড়িটার মতো শব্দ। পাশে যারা খেলত, তাদের ছিল শত শত — বাবা-মায়ের ভাষায়, তারা ছিল অনর্গল বকবক করা দল। নিজের পরিবারের মানুষগুলোর নাম সে মনে রাখতে পারত না। চোখে চোখ রাখত না, কোলে উঠতে চাইত না। কিছু খাবার সে মুখেই তুলতে পারত না — স্বাদের জন্য নয়, হাতে-মুখে লাগা অনুভূতিটার জন্য। কথা বলত একই সুরে, ওঠা-নামা ছাড়া। আঙুল নাড়াত। পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে হাঁটত।
পরিবার এসব আচরণের একটা নাম দিয়ে ফেলেছিল নিজেরাই — “ব্রকিজম”। যখন দায়িত্ব নিয়ে কেউ নাম দেয় না, পরিবার তখন এটাই করে।
তবে কঠিন অংশটা এসবের কিছুই নয়। কঠিন ছিল এক কাজ থেকে আরেক কাজে যাওয়া। একটা কিছু থামিয়ে পরেরটা ধরানো মানেই ছিল এমন ভেঙে পড়া, যাকে বাবা-মা “বিপর্যয়” ছাড়া আর কিছু বলতে পারেন না। চার বছর বয়সে একটি বেসরকারি স্কুল তাকে নিয়েছিল, আর বছর শেষ হওয়ার আগেই ফিরিয়ে দিয়েছিল — যে রুটিনে একটা শিশু টিকতেই পারে না, সেই রুটিনে স্কুল চলে না।
মায়ের মনে আছে, তিনি ছেলেকে জড়িয়ে ধরতে বলতেন। ব্রক ঠিক যতবার বলা হয়েছে, ততবারই জড়িয়ে ধরত। একবারও বেশি নয়, আর কখনো নিজে থেকে নয়।
নিজের সন্তানের জন্য ভেতরটা ছিঁড়ে যায়, কারণ মনে হয় সে সুখী নয়। আর একটা অপরাধবোধও থাকে — এই যে সবটুকু সময় এই একটা কঠিন বাচ্চার পেছনেই যাচ্ছে, বাকি বাচ্চাগুলোর কী হবে?
— নাইদোনা
এই লাইনটা আমরা রেখে দিলাম, কারণ এটাই কেউ ছাপে না। এটা রোগ নির্ণয়ের কথা নয়। এটা হলো — একটা পরিবার সেই নির্ণয়ের অপেক্ষায় থেকে কী হয়ে যায়, তার কথা।
তারপর একজন কাগজে লিখলেন
সরকারি স্কুলের প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার পর, ছয় বছর বয়সে সেখানেই তার অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডার শনাক্ত হয়। তাকে দেওয়া হলো অটিস্টিক শিশুদের জন্য গড়া একটি শ্রেণিকক্ষ, আর অটিস্টিক শিশুদের জন্য গড়া পড়ানোর পদ্ধতি।
সেই বছর শেষ হওয়ার আগেই সে কয়েকটি বিষয়ে সাধারণ ক্লাসে ফিরে গেল। ভেঙে পড়ার ঘটনা কমে এল অনেক। পরে একটি মূল্যায়নে ছোট আর নির্দিষ্ট একটা জিনিস ধরা পড়ল — ওয়ার্কিং মেমোরির দুর্বলতা, যা চুপচাপ তার লেখা নষ্ট করে দিচ্ছিল — আর শিক্ষকেরা লেখার সময় তাকে বাড়তি ধরে ধরে সাহায্য করতে শুরু করলেন। কোনো নিরাময় নয়। একটা সংশোধন — কেউ যথেষ্ট কাছ থেকে তাকিয়েছিল, তাই ধরা পড়েছিল।
এটুকুই। হস্তক্ষেপটা অসাধারণ কিছু ছিল না। ছিল খুবই সাধারণ, কাজ করেছিল, আর এসেছিল চার বছর দেরিতে।
স্ক্যানারের পাশে সে কেন বসে আছে
আমাদের ডায়েরির পাতায় যে ছবিটা, সেটি সেন্টার ফর অটিজম রিসার্চে তোলা — একটি এমআরআই যন্ত্রের পাশে ব্রক। যে গবেষণাতেই সে যোগ দেওয়ার যোগ্য ছিল, সব কটিতেই সে স্বেচ্ছায় অংশ নিয়েছে।
একটি গবেষণায় ইমেজিং আর ইনফ্রারেড আই-ট্র্যাকিং ব্যবহার করে দেখা গেছে, মস্তিষ্কের লিম্বিক সিস্টেমের ভেতরের অস্বাভাবিক সংযোগগুলোই সামাজিক সম্পর্ক কঠিন করে তোলার একটা কারণ। আরেকটিতে সে এমন খেলা খেলেছে, যা মুখের ভাব আর অনুভূতিকে জোড়া মিলিয়ে চিনতে শেখায়। তৃতীয়টিতে সরাসরি মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক সাড়া মাপা হয়েছিল, আর বেরিয়ে এসেছিল এমন একটা কথা যা আমরা প্রায় প্রতিদিন ভাবি: অটিজম আছে যেসব শিশুর, তারা শব্দ প্রক্রিয়া করে অন্য শিশুদের চেয়ে সেকেন্ডের ভগ্নাংশ পরিমাণ দেরিতে।
সেকেন্ডের ভগ্নাংশ। এটা আচরণ নয়, স্বভাব নয়, বাবা-মায়ের ব্যর্থতা নয়। বেড়ে ওঠা একটা মস্তিষ্কে মেপে ফেলা যায় এমন একটা দেরি — যা একটা যন্ত্র শুনে ফেলতে পারে অপেক্ষার তালিকার অনেক আগেই।
এসবের ব্যাখ্যায় তার বাবা খুব সহজ কথা বলেছেন। ব্রকের স্বভাবই হলো, সে সাহায্য করতে চায়; তাই বাবা তাকে উৎসাহ দেন।
আর হ্যাঁ, সে ভালো আছে
সে বই পড়ে যেভাবে মানুষ শ্বাস নেয়। কম্পোস্ট বানায়, বাগান করে, ভিডিও বানায়, যন্ত্রপাতি খুলে দেখে। তার পরিকল্পনা, শ্যাওলা থেকে জ্বালানি বানানোর একটা কারখানা গড়বে; আর ফেলে দেওয়া সিগারেটের ফিল্টার দিয়ে কাজের কিছু একটা করার উপায় খুঁজবে। বাবা বলেন, সে পৃথিবীটাকে আরেকটু সবুজ, আরেকটু পরিষ্কার করে যেতে চায়।
গত কয়েক বছর নিয়ে তার মায়ের বলা কথাটাই এই গল্পের সবচেয়ে ছোট আর সবচেয়ে বড় বাক্য:
আমি ওকে এত দূর আসতে দেখেছি। যারা ওর আশপাশে ছিল, সবাই ওকে বড় হতে দেখেছে — আর এই বদলটা তারা বিশ্বাসই করতে পারে না।
— নাইদোনা
এই পাতা আমাদের ডায়েরিতে কেন
কারণ ফেনী, ফরিদপুর কিংবা চট্টগ্রামে আজও একজন মা ঠিক এই বাক্যটাই বলছেন — কিছু একটা আলাদা — আর নাইদোনাকে যা বলা হয়েছিল, তাঁকেও তাই বলা হচ্ছে। নির্দয়তা থেকে নয়। হিসাবের কারণে: বাংলাদেশে প্রতি দশ লাখ মানুষের জন্য স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্ট আছেন প্রায় একজন, আর তাঁদের প্রায় সবাই মুঠোভরা কয়েকটি শহরে।
চার বছর — এই ফাঁকটা বন্ধ করতেই আমাদের থাকা। আরও চৌকস কোনো বিশেষজ্ঞ দিয়ে নয়; বরং শোনার কাজটা শিশুর কাছে নিয়ে গিয়ে — ঘরের ভেতরে, বাংলায়, সাধারণ একটা ফোনে — যাতে দুই বছরে একজন মা যে কথাটা বলেন, সেটা দুই বছরেই কাগজে ওঠে।
ব্রকের গল্প আমাদের নয়। ব্রায়ান আর নাইদোনা এটি বলেছেন চিলড্রেনস হসপিটাল অব ফিলাডেলফিয়া-কে, আমরা শুধু সেটিকে একটু পূর্বে বয়ে এনেছি। তার সঙ্গে আমাদের দেখা হয়নি। স্টেপিংয়ের কেউ তার চিকিৎসা করেনি, স্ক্রিনিং করেনি, তার সেবার সঙ্গে কোনোভাবেই যুক্ত ছিল না।
তবু তার পাতাটা আমরা রেখে দিয়েছি, কাজটার আকারের জন্য। অবিশ্বাসের কারণে চার বছর হারিয়ে ফেলা একটা ছেলে বড় হয়ে বিকেলগুলো কাটিয়েছে স্ক্যানারের ভেতর নিশ্চুপ শুয়ে — যাতে তার নিজের মস্তিষ্কের সেই দেরিটুকু মাপা যায়, লেখা যায়, আর সেটা কাজে লাগিয়ে পরের শিশুকে আরও আগে খুঁজে পাওয়া যায়।
সে চায় পৃথিবীটাকে আরেকটু পরিষ্কার করে যেতে। শৈশবের একটা অংশ দিয়ে সে পৃথিবীটাকে আরেকটু আগেভাগে করে গেছে।

